28.10.2026

১৪ কোটি টাকার সেতু, ওপারে শুধু ধানখেত পশ্চিম পাশে নেই সড়ক, জনবসতিও নেই; প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন

0
sara
Spread the love
জামালপুর প্রতিনিধি
জামালপুর শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করা হয়েছে ৯৫ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু। ব্যয় হয়েছে ১৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। তবে সেতুটি পার হলেই দেখা মেলে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। নেই কোনো সংযোগ সড়ক, নেই আশপাশে উল্লেখযোগ্য জনবসতিও। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির ব্যবহার ও প্রকল্প গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জামালপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে হাটচন্দ্রা মিয়াবাড়ি বাজার। বাজার থেকে আরও প্রায় ৫০০ মিটার পশ্চিমে ঝিনাই নদ। নদটির পূর্ব পাশে রয়েছে জনবসতি। কিন্তু পশ্চিম পাশে মূলত ফসলি জমি। সড়ক তো নেই-ই, আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাতেও কোনো জনবসতি নেই।
এই স্থানেই নির্মাণ করা হয়েছে ৯৫ মিটার দীর্ঘ সেতুটি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ‘ময়মনসিংহ অঞ্চল পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ২০২২ সালের ১৫ মার্চ নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। এরপর সেতুটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সেতুটির প্রস্থ ৯ দশমিক ৮ মিটার এবং নির্মাণ ব্যয় ১৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
সেতু আছে, সংযোগ সড়ক নেই
সেতুটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পশ্চিম প্রান্তে কোনো সড়ক নেই। ফলে সেতু দিয়ে পার হওয়ার পর যানবাহন আর এগোনোর সুযোগ নেই। সামনে শুধু ফসলের মাঠ।
এলজিইডির জামালপুর কার্যালয়ের সদ্য বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদও পশ্চিম পাশে সড়ক না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ওই এলাকায় সড়ক নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সেতু নির্মাণের আগে তাঁরা এমন কোনো সেতুর দাবি জানাননি। কারণ সেতুর পশ্চিম পাশে বসতি না থাকায় সাধারণ মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের প্রয়োজনও নেই।
স্থানীয়দের ব্যবহার সীমিত
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুকনো মৌসুমে পশ্চিম পাশের জমিতে ধান ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হয়। ওই এলাকার কিছু মানুষের জমি রয়েছে সেতুর ওপারে। ফলে কৃষিকাজের প্রয়োজনে কেউ কেউ সেতুটি ব্যবহার করেন।
তবে বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভিন্ন। বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যায়। তখন সেতুর পশ্চিম প্রান্ত থেকে আশপাশের এলাকায় যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সালামের ভাষ্য অনুযায়ী, সেতুর পশ্চিম পাশে মূলত কৃষিজমি থাকায় এর ব্যবহার সীমিত। অন্যদিকে বানু বেগম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা সেতুটিতে ধান শুকানোর কথাও জানিয়েছেন।
‘কেন সেতু নির্মাণ করা হলো?’
স্থানীয় বাসিন্দা আশেক আলী প্রশ্ন তুলেছেন, কয়েক কিলোমিটার ফসলের মাঠ পেরিয়ে যে এলাকাগুলো রয়েছে, সেখানকার মানুষ এই সেতু দিয়ে কীভাবে নিয়মিত যাতায়াত করবে। তাঁর মতে, সেতুর পশ্চিম পাশের এলাকায় যেতে হলে ধানখেতের মধ্য দিয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।
এ কারণে স্থানীয়দের প্রশ্ন—যেখানে সেতুর এক পাশে কোনো সড়ক নেই এবং আশপাশে জনবসতিও নেই, সেখানে এত বড় অর্থ ব্যয়ে সেতু নির্মাণের আগে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য ব্যবহার কতটা যাচাই করা হয়েছিল?
তদন্তের দাবি
জামালপুরের নগর উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম মনে করেন, জনগণের অর্থে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োজন, স্থানীয় মানুষের চাহিদা এবং সম্ভাব্য উপকারভোগীদের বিষয়টি আগে যাচাই করা জরুরি।
তাঁর মতে, একটি সেতুর এক পাশে যদি সড়কই না থাকে, তাহলে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, প্রয়োজন নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তিনি সেতুটি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও পরিকল্পনা খতিয়ে দেখে কোনো অনিয়ম বা দায় থাকলে তা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।
বড় প্রকল্প, বড় প্রশ্ন
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ‘ময়মনসিংহ অঞ্চল পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় জামালপুর ছাড়াও শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জে বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ ৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা এবং মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যেখানে মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করা, সেখানে একটি সেতু নির্মাণের পরও যদি তার এক পাশে সড়ক না থাকে, তাহলে সেই প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। জামালপুরের এই সেতু তাই এখন স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *